Marxists Internet Archive
Bangla Section
অর্থনৈতিক ও দার্শনিক খসড়া
কার্ল মার্কস
তৃতীয় পান্ডুলিপি: ব্যক্তি সম্পত্তি শাসনের অধীনে এবং সমাজতন্ত্রে মানবিক প্রয়োজনসমূহ
আমরা দেখেছি সমাজতন্ত্রে মানব অভাবের সমৃদ্ধি কি বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। আর তাই উৎপাদনের এক নতুন ধরণ এবং উৎপাদনের এক নতুন বিষয় উভয়ই কি বৈশিষ্ট্য অর্জন করে, তাও দেখা যায়। তা হল মানব প্রকৃতির শক্তির এক নতুন প্রকাশ আর মানব প্রকৃতির এক নতুন সমৃদ্ধি। ব্যক্তি সম্পত্তির অধীনে তাদের বৈশিষ্ট্যটা উল্টো। প্রত্যেক ব্যক্তিই এখানে অন্যের মাঝে কোন নতুন অভাব সৃষ্টির জন্য ফটকাবাজী করে, যাতে তাকে নতুন করে কোরবানি দেয়ার দিকে তাড়িয়ে নেয়া যায়, যাতে সে নতুন আরেক নির্ভরশীলতায় আটকা পড়ে আর যেন তাকে নতুন ধরণের উপভোগের প্রলোভনে অর্থনৈতিকভাবে বিনষ্ট করা যায়। প্রত্যেকেই এখানে অপরের ওপর এক বিজাতীয় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেন তার নিজের স্বার্থপর অভাবের পরিতৃপ্তি ঘটে। বিষয়ের পরিমাণে বৃদ্ধি তাই দোসর করে নিয়ে আসে বিজাতীয় ক্ষমতাগুলোর রাজত্বের বিস্তৃতি, মানুষ যার কাছে দাসত্বে বাঁধা। আর প্রতিটি নতুন উৎপন্নই পারস্পরিক জোচ্চুরী আর লুটপাটের নতুন এক উর্বর সম্ভাবনা হাজির করে। মানুষ সর্বদাই মানুষ হিসেবে দরিদ্রতর হয়ে ওঠে, যদি সে বৈরী সত্তাকে পরাভূত করতে চায় তবে তার অর্থ চাহিদা বৃহত্তর হয়ে ওঠে। তার অর্থের ক্ষমতা উৎপাদনের আয়তন বৃদ্ধির ব্যাস্তানুপাতিক হারে ক্ষয় হতে থাকে : মানে, অর্থের ক্ষমতা যত বাড়ে তার অভাব ভাব তত বাড়তে থাকে।
অর্থের অভাব তাই অর্থনৈতিক পদ্ধতির উৎপাদন করা এক বাস্তব অভাব; আর তা অর্থনৈতিক পদ্ধতির উৎপাদন করা একমাত্র অভাব। অর্থের পরিমাণই হয়ে ওঠে সর্বদা বৃহত্তর মাত্রায় এর একমাত্র প্রভাবক্ষম গুণ। ঠিক যেমন সে সব জিনিসকে তার অমূর্ত আঙ্গিকে নামিয়ে আনে, তেমনি সে নিজেও নেমে আসে নিজের সঞ্চালনের পথে এক পরিমাণগত আবদ্ধতায়। অপরিমিতি আর অমিতাচার হয়ে ওঠে তার আসল কায়দা কানুন।
বিষয়ীগতভাবে তা অংশত প্রতিভাসিত হয় একটা ঘটনায়। তা হচ্ছে এই যে, উৎপন্ন এবং অভাবের বিস্তৃতি হয়ে ওঠে ফন্দিবাজ, সর্বদা হিসেব কষা অমানবিক, পরিশোধিত, অস্বাভাবিক এবং কাল্পনিক রুচির প্রতি এক দাস মনোবৃত্তি। ব্যক্তি সম্পত্তি জানে না কি করে স্থুল অভাবকে মানবিক অভাবে বদলে নিতে হয়। এর ভাববাদ হল রঙচঙে কল্পনা, খেয়াল আর হুজুগ । কোন হারেমের খোজাই তার স্বৈরাচারী প্রভুকে এত নীচভাবে তোয়াজ করে না, নিজের নিস্প্রভ ক্ষমতা দিয়ে সামান্য একটু সুবিধা পেয়ে ফুর্তি লুটবার জন্য এত ঘৃণ্য উপায় অবলম্বন করে না, যতটা করতে পারে এই শিল্পওয়ালা খোজা- মানে উৎপাদনকারী। একজন শিল্প খোজা এসবই করতে পারে নিজের জন্য টুকরো রূপার জন্য, তার পরম ভালোবাসার তারই মত কোন আল্লার বান্দার পকেট থেকে সোনার পাখিগুলোকে চক্মা লাগানোর জন্য। সে অন্যের সবচাইতে বিকৃত কামনার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করে, তার এবং তার প্রয়োজনের মাঝে বেশ্যার দালালের ভূমিকা পালন করে। তার মাঝে মুমূর্ষু রুচিকে উত্তেজিত করে, তার প্রতিটি দূর্বলতার অপেক্ষায় ওত পেতে থাকে। এসব করার কারণ একটাই, যাতে সে তার এই ভালোবাসার সেবার জন্য নগদ কিছু দাবি করতে পারে। (প্রতিটি উৎপন্নই একেকটা টোপ, যা দিয়ে প্রলোভনে ফেলে অন্যের টাকাকড়ি, তার সত্তাটাই হাতড়ে নেয়া যায়। প্রতিটি বাস্তব এবং সম্ভাব্য অভাবই একটা দূর্বলতা, যা মাছিটাকে আঠার পাত্রের দিকে নিয়ে যায়। জনসম্প্রদায়গত মানব চরিত্রের সাধারণ শোষণ ঠিক মানুষের প্রতিটি অসম্পূর্ণতার মত স্বর্গের সাথে এক বন্ধন, এমন এক রাস্তা যা পুরোহিতকে তার হৃদয়ে ঢুকবার উপায় করে দেয়। প্রতিটি অভাবই কারোর প্রতিবেশীকে অমায়িক সৌহার্দ্যতার ছদ্মবেশে এই প্রস্তাব দেবার সুযোগ, যে : প্রিয় বন্ধু, তোমার যা প্রয়োজন তোমাকে তা দিলাম, তবে তুমি তো চুক্তিনামার শর্তগুলো জানই; যে কালি দিয়ে দাসখত্ করে তোমার নিজেকে আমার হাতে তুলে দিতে হবে তাও তুমি চেনো; সুতরাং তোমার আমোদ মেটানোর জন্যই, আমি তোমাকে ঠকাচ্ছি।)
এই বিচ্ছিন্নতা নিজেকে প্রকাশ করে সেই অভাবের পরিশীলনে এবং (তাদের পরিতৃপ্তি সাধনের) উপায়ে। একদিকে উৎপাদিত হয় পাশবিক বর্বরতা, অপরদিকে অভাবের এক সম্পূর্ণ, স্থুল, অমূর্ত সরলীকরণ। অথবা এতে এটি নিছক এর বিপরীত হয়ে নিজেকেই পুনরুৎপাদিত করে। এমনকি শ্রমিকদের একটু তাজা হাওয়ার প্রয়োজনও আর প্রয়োজন বলে গণ্য হয় না। মানুষ ফিরে আসে এক গুহাবাসের জীবনে, যা এখন যেভাবেই হোক সভ্যতার সংক্রমণে ধুঁকছে। সেই আবাসেও তার দখল নিতান্ত অনিশ্চিত, কারণ তার কাছে তা এক বিজাতীয় আবাস, যে কোনও দিন যা কেড়ে নেয়া হতে পারে। তা এমন এক স্থান, পাওনা না মেটালে যা যেকোন দিন হাত ছাড়া হয়ে যেতে পারে। এই মুর্দাঘরের জন্যও তাকে পয়সা দিতে হয়। আলো বাতাস খেলা কোন বাসস্থান (এস্কাইলাসের প্রমিথিউস যাকে সর্বোত্তম বর বলে গণ্য করেছেন, যা দিয়ে তিনি বর্বরকে মানবসত্তায় বদলে ছিলেন) শ্রমিকের কাছে আর অস্তিত্বমান থাকে না। মানুষের প্রয়োজনের খতিয়ান থেকে আলো, বাতাস, সামান্য প্রাণীসুলভ পরিচ্ছন্নতাও বাদ পড়ে যায়। পঙ্কিলতা, মানুষের এই বদ্ধতা, পচন- সভ্যতার এই আবর্জনা (একদম আক্ষরিকভাবে বলতে গেলে) হয়ে ওঠে তার জন্য জীবনের উপাদান । নিরেট, অস্বাভাবিক বিকৃতি, পঁচা-গলা প্রকৃতি হয় তার জীবন উপাদান । মানবিক কেতায় তো দূরের কথা, এমনকি অমানবিকভাবেও তার আর কোন বোধের অস্তিত্ব থাকে না, আর তাই কোন প্রাণীসুলভ বোধেরও আর অস্তিত্ব থাকে না। মানব শ্রমের স্থুলতম পদ্ধতি (হাতিয়ার) ফিরে আসছে : যেমন রোমান দাসদের ট্রেড মিলই বহু ইংরেজ শ্রমিকের উৎপাদনের, অস্তিত্ব রক্ষার উপায়। মানুষের যে কোনও মানবিক প্রয়োজন, শুধু তা-ই নয়- এমনকি প্রাণীসুলভ চাহিদাগুলোও উধাও হয়ে গেছে। একজন আইরিশের কাছে খাবারের প্রয়োজন ছাড়া এখন আর কোন প্রয়োজন নেই। সেই খাবার মানে আবার শুধু আলু, সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানের আধপঁচা আলু। আর ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের প্রতিটি শিল্প শহরে এর মধ্যেই একটা করে ছোট আয়ারল্যান্ড গড়ে উঠেছে। বন্য মানুষ ও পশুদের অন্ততঃ শিকার, ঘুরে বেড়ানো, সঙ্গ লাভের চাহিদা আছে। যন্ত্র আর শ্রমের সরলীকরণ একজন শ্রমিককে মানব সত্তা বহির্ভূত করে গড়তে ব্যবহৃত হয়। আর তা তৈরী করতে শ্রমিক হচ্ছে একদম অপরিপক্ক এক মানবসত্তা, এক শিশু। শ্রমিক হয়ে পড়েছে অবহেলিত এক শিশু। যন্ত্র দূর্বল মানবসত্তাকেই যন্ত্র বানিয়ে ফেলতে নিজে মানব সত্তার দূর্বলতার স্থানে জায়গা করে নেয়।
প্রয়োজন এবং উপায়ের (তা মেটানোর জন্য) বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়া কি করে প্রয়োজন এবং উপায়ের অনুপস্থিতি জন্ম দেয় তা প্রদর্শিত হয় রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রীদের দ্বারা (আর পুঁজিপতিদের দ্বারা : রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রীদের কথা বলতে গিয়ে আমরা সাধারণভাবে সর্বদাই অভিঞ্চতাবাদগত ব্যবসায়ীদের কথাই বলছি। তারা পুঁজিপতিদের বৈঞ্চানিক কৈফিয়ত এবং প্রেক্ষিত)। তাদের কাছে যা দেখতে পাই তা হল:
(১) শ্রমিকের প্রয়োজনকে শরীরবৃত্তিক অস্তিত্বের সবচেয়ে সাদামাটা, শোচনীয়তম স্তরে নামিয়ে আনা হয়। তার ক্রিয়াশীলতাকে সবচেয়ে অমূর্ত যান্ত্রিক সঞ্চালনে পর্যবাসিত করা হয়। এমনি করে রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রী বলেন : ক্রিয়াশীলতা বা উপভোগ ব্যতীত আর কোন প্রয়োজন নেই। এই জীবনকেও তিনি মানব জীবন এবং অস্তিত্ব বলে ডাকেন!
(২) জীবনের (অস্তিত্বের) কৃশতম আঙ্গিককে মাপকাঠি ধরে নেয়া হয়। আদতে সাধারণ মাপকাঠি বলেই ধরে নেয়া হয়- সাধারণ, কারণ তা ব্যাপক মানুষের ওপর প্রয়োগ করা যায়। রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রী শ্রমিককে এমন এক অসাড় সত্তায় বদলে দেন যার কোন প্রয়োজন বলতে কিছু নেই, ঠিক যেমন করে তিনি তার ক্রিয়াশীলতাকে সব ক্রিয়াশীলতা হতে এক পরম অমূর্তায়নে বদলে দেন। তাই তার কাছে শ্রমিকের যে কোন বিলাসিতাকে তিরস্কারযোগ্য মনে হয়। আর যা কিছু চাঁচাছোলা প্রয়োজনকে ছাড়িয়ে যায়- (তা পরোক্ষ উপভোগই হোক বা ক্রিয়াশীলতার প্রদর্শনই হোক) তাই ওনার কাছে বিলাস বলে মনে হয়। রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র, ধনদৌলতের এই বিঞ্চান তাই যুগপৎভাবে পরিত্যাগের, অভাবের, সঞ্চয়ের বিঞ্চান। আর যখন সে মানুষের কাছ হতে একটু তাজা বাতাস বা ইচ্ছেমত হাত পা নাড়ার প্রয়োজনটাও কেড়ে নেয়, তখনই সে বাস্তবে ঐ বিন্দুতে পৌঁছয়। চমকপ্রদ শিল্পের এই বিঞ্চান যুগপৎভাবে আত্ম- নিগ্রহের বিঞ্চান। এর বাস্তব আদর্শ আত্ম- নিগ্রহ তবে সে নিজে অর্থপিশাচ কৃপণ, সে চায় আত্ম- নিগ্রহী উৎপাদনশীল দাস। তার নৈতিক আদর্শ হচ্ছে সেই শ্রমিক যে তার মজুরীর ভাগটা সঞ্চয় ব্যাংকে জমা দেয়। এমন কি এই বংশবদ ভাবটি উপস্থাপন করে এমন টিকে থাকার কলাটি সে পেয়ে গেছে তৈরী করা অবস্থায়। সেই কলাকে ভাবালুতায় স্নান করিয়ে মঞ্চেও তোলা হয়েছে। এমনি করে দুনিয়াবী আর পেটুক চেহারা নিয়েও রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র এক বাস্তব নীতি বিঞ্চান, সব বিঞ্চানের মাঝে সবচাইতে নৈতিক। এর মূল থিসিস হল আত্ম-পরিত্যাগ, জীবন ও সমস্ত মানবিক প্রয়োজনের পরিত্যাগ। তুমি যত কম খাও, পান কর আর বই কেনো; যত কম তুমি নাটক দেখতে যাও, নৃত্যশালায় যাও, গণ মিলনায়তনে যাও; যত কম তুমি চিন্তা কর, ভালোবাসো, তত্ত্ব বানাও, গান গাও, ছবি আঁকো, ততই বেশি তোমার সঞ্চয় বাড়বে- তোমার টাকার সিন্দুক ততই ফুলে ফেঁপে উঠবে- যা পোকাও খাবে না, মরচেও ধরবে না- সেই তোমার পুঁজি। তুমি নিজে যত কম, নিজের জীবনকে যত কম প্রকাশ কর, তত বেশি তুমি অধিকার করবে। মানে, তোমার বিজাতীয় হওয়া জীবন, তোমার বিচ্ছিন্ন সত্তার ভান্ডার ততই বৃহত্তর হবে। রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রী জীবন ও মানবতা হতে তোমার কাছ থেকে যা ছিনিয়ে নেয়, তা পুষিয়ে দেয় টাকাকড়ি আর ধনদৌলত দিয়ে; তুমি যা পারো না, তোমার টাকা তা পারে। তোমার টাকা খাওয়া-দাওয়া করতে পারে, নৃত্যশালায়, থিয়েটারে যেতে পারে; ঘুরে বেড়াতে পারে, শিল্পকলাকে ঠিকঠাক করতে পারে। শিক্ষাদীক্ষা, অতীতের গৌরব, রাজনৈতিক ক্ষমতা- তুমি যেমন চাও তোমার টাকা তাকে তেমন করে দেবে। টাকা এর সবই কিনতে পারে; এ হল এক সত্যিকারের আশীর্বাদ। এত কিছু হয়েও সে নিজেকে বাড়ানো ছাড়া আর কিছু করতে চায় না। কারণ বাকি সবকিছুই তো সর্বোপরি তার দাস। আর আমি মালিকেরও মালিক, ভৃত্যরও মালিক, তা হলে চাকর দিয়ে আমি কি করবো! সব আবেগ, সব ক্রিয়াশীলতাই তাই অবশ্যই আকন্ঠ লোভে নিমজ্জিত। বেঁচে থাকতে চাওয়ার জন্য যতটুকু দরকার শ্রমিক হয়তো ততটুকুই পাবে, আর তা পাবার জন্যই হয়তো সে বেঁচে থাকতে চাইবে।
এটা সত্য যে রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের ক্ষেত্রে এখন একটা মতান্তর উদিত হয়েছে। এক পক্ষ (লডারডেল, ম্যালথাস ইত্যাদি) বিলাসের সুপারিশ করে ব্যয়সংকোচকে অভিসম্পাত করেন। অন্য পক্ষ (সে, রিকার্ডো)আবার ব্যয়সঙ্কোচের সাফাই গেয়ে বিলাসকে অভিসম্পাত দেন। আগের পক্ষ স্বীকার করে যে তারা শ্রম উৎপাদন করতেই বিলাস চায় (মানে পরম ব্যয়সংকোচ); পরের পক্ষ স্বীকার করে তারা ধন-দৌলত উৎপাদন করতেই ব্যয়সংকোচের সাফাই গায়। লডারডেল-ম্যালথাস ঘরাণা এক রোমান্টিক ধারণা পোষণ করে। তারা বলে যে কেবল ধনলিপ্সারই ধনীদের সম্পদ ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করার একক দায় থাকা ঠিক নয়। আবার সমৃদ্ধির সরাসরি উপায় হিসেবে অমিতাচারকে লাই দিতে গিয়ে তারা নিজেদের নীতির সাথেই বিরোধ বাঁধান। তাই অপর পক্ষ সুযোগ পেয়ে ব্যাগ্রভাবে বিরোধীদের কাছে প্রমাণ করে দেন যে অমিতাচারী হয়ে আমি আমার সম্পদ না বাড়িয়ে বরং কমিয়ে ফেলি। মোদ্দা কথায়, হুজুগ আর ধনলিপ্সাই যে উৎপাদন নির্ধারণ করে- এ কথা না মেনে সে- রিকার্ডো ঘরানা আসলে ভন্ডামী করে। তারা ভুলে যায় পরিশোধিত প্রয়োজনের কথা, ভুলে যায় যে ভোগ ছাড়া কোন উৎপাদন হবেনা, ভুলে যায় প্রতিযোগিতার ফল হিসেবে উৎপাদন শুধু আরো বিস্তৃত এবং বিলাসী হয়ে ওঠে। তারা ভুলে যায় যে তার দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারেই- ব্যবহার দ্বারা কোন জিনিসের মূল্য নির্ধারিত হয়, আর ব্যবহারকে নির্ধারণ করে ফ্যাশন। সে দেখতে ইচ্ছা করে যে শুধুই প্রয়োজনীয় জিনিস উৎপন্ন হচ্ছে, কিন্তু ভুলে যায় যে খুব বেশি পরিমাণে প্রয়োজনীয় জিনিসের উৎপাদন খুব বিশাল ব্যবহারহীন জনগোষ্ঠী উৎপাদন করে। উভয়পক্ষই ভুলে যায় যে অমিতাচার আর কিপটেমি, বিলাস আর আত্ম- নিগ্রহ, প্রাচুর্য আর দারিদ্র সমান।
তুমি যদি মায়ায় পড়ে গোল্লায় যেতে না চাও, তাহলে তোমার কেবল প্রত্যক্ষ সংবেদনের পরিতৃপ্তিতেই কিপ্টেমি করলে চলবেনা (যেমন খাওয়া দাওয়ায় কিপ্টেমি এইসব) সব রকম সাধারণ স্বার্থ, সহানুভূতি, বিশ্বাস ইত্যাদির ভাগাভাগিতেও কিপ্টেমি করতে হবে।
তোমাকে অবশ্যই সব কিছু বিক্রয়যোগ্য, মানে প্রয়োজনীয় করে তৈরী করতে হবে। যদি রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রীর কাছে জানতে চাই: আমি যদি আমার শরীরটাকে অন্যের লালসার কাছে বিক্রয় হতে দিয়ে টাকা কামাই করি তবে কি আমি অর্থনীতির নিয়ম মানছি? (ফরাসি দেশের কারখানা শ্রমিকেরা তাদের মেয়ে, বউদের গণিকাবৃত্তিকে বাড়তি কর্মঘন্টা বলে। কথাটা আক্ষরিকভাবে ঠিক।)- অথবা আমি যদি আমার বন্ধুকে দাস ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দিই, তাহলে কি রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের নীতি মানা হল? (আর বাধ্যতামূলক তালিকাভুক্তি ইত্যাদি করে ব্যবসার আঙ্গিকে সব সভ্য দেশেই তো সরাসরি মানুষ বিক্রি হয়।) তখন রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রী জবাব দেন : তুমি এসব করলে আমার নিয়ম ভাঙছেনা; কিন্তু দেখো এ ব্যাপারে আমার শাস্ত্রের চাচাতো ভাই নীতিবিদ্যা, মামাতো ভাই ধর্ম কি বলে। আমার রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রীয় নীতিবিদ্যায় তোমাকে নিন্দা করবার কিছু নেই। কিন্তু- এখন আমি কাকে বিশ্বাস করবো, রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র না নীতিবিদ্যাকে? রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের নৈতিকতা হচ্ছে দখল, কাজ, সংযম, ব্যয়সংকোচ- তবে রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র আমার প্রয়োজন মেটাবার অঙ্গীকার করে। নীতিবিদ্যার রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র হল উঁচু মাপের ভালোমন্দঞ্চর বোধের সম্পদের, সদ্গুণের,ইত্যাদির শাস্ত্র; কিন্তু আমি যদি বেঁচেই না থাকি তবে সদ্গুণ নিয়ে বাঁচবো কি করে? আমি কিছুই যদি না জানি তো ভালমন্দটা জানবো কি করে? দুটো শাস্ত্রের বলয়ই আমার প্রতি ভিন্ন এবং উল্টো মাপকাঠি প্রয়োগ করে। নীতিবিদ্যা এক কথা বলে তো রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র বলে আরেকটা। আগের বলা সমস্যাটা পল্লবিত হয় একদম বিচ্ছিন্নতার এই চরিত্র হতে; কারণ এদের প্রত্যেকটা হচ্ছে মানুষের নির্দিষ্ট বিচ্ছিন্নতা আর তারা প্রত্যেকেই বিচ্ছিন্ন প্রামাণিক ক্রিয়াশীলতার এক বিশেষ ক্ষেত্রের দিকে মনোযোগ আকৃষ্ট করে। প্রত্যেকেই একে অপরের প্রতি এক বিচ্ছিন্ন সম্পর্কে দাঁড়িয়ে থাকে। এভাবে মিশেল শিভালিয়ে নীতিবিদ্যাকে পাত্তা না দেবার দোষে রিকার্ডোকে গালমন্দ করেন। কিন্তু রিকার্ডো তো শুধু রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রকে নিজের ভাষায় কথা বলতে দিচ্ছেন, সে যদি নৈতিক ভাবে কথা না বলে রিকার্ডোর কি দোষ! শেভালিয়ে যতদূর নৈতিকতার বালাই দিয়েছেন ততদূরই তিনি রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রকে অমূর্তায়িত করেছেন, কিন্তু যতদূর তিনি রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র চর্চা করেন, তদ্দুর তিনি নীতিবিদ্যা হতে বাস্তবিক এবং প্রামাণিকভাবে অমূর্তায়ন করেন। নীতিবিদ্যার সাথে রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের সম্পর্ক (তা যদি খেয়ালখুশির, কোন সম্ভাব্য আর তাই অনাবিষ্কৃত আর অবৈঞ্চানিক সম্পর্ক না হয়, যদি তা শুধু দেখানোর জন্য না হয়ে প্রামানিক বলেই হয়) কেবল নীতিবিদ্যার প্রতি রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের নিয়মের সম্পর্কই হতে পারে। যদি এমন কোন সংযোগ না থাকে, অথবা যদি ঘটনাটা হয় উল্টো, তাহলে রিকার্ডো কি করতে পারবেন? তদুপরি রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র এবং নীতিবিদ্যার মাঝের বিরোধটা কেবল এক প্রতীয়মান বিরোধ, আর তা ঠিক যতটা বিরোধিতা ততটাই বিরোধিতা নয়। আসলে যা হয় তা হল যে, রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র নৈতিক নিয়মগুলোকে এর নিজের মত করে প্রকাশ করে।
ব্যয় সংকোচ হিসেবে রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের নীতি সবচেয়ে চমৎকারভাবে এর জনসংখ্যাতত্ত্বেঞ্চর মাঝে দেখা যায়। এই তত্ত্ব দেখে যে মানুষের গোনাগুণ্তি নেই। এমন কি মানুষের অস্তিত্বটাও একটা পরম বিলাস; আর শ্রমিক যদি জ্ঞনৈতিকঞ্চ হয়, তবে সে ছেলেমেয়ে জন্ম দেয়াটা বন্ধ রাখবে। (যারা যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংযম প্রদর্শন করতে পারবে তাদের জন্য মিল জনসংবর্ধনার সুপারিশ করে, যারা এরকম বন্ধ্যা বিবাহ না মেনে পাপ করে তাদের জন্য গণতিরস্কার এর সুপারিশ করেন। এই নীতিবিদ্যা কি আত্ম- নিগ্রহবাদ নয়?) জনগণের উৎপাদন জনদারিদ্র বলে আবির্ভূত হয়।
ধনীদের সাপেক্ষে উৎপাদনের কি মানে তা অনাবৃত হতে দেখা যায় উৎপাদনের সঙ্গে দরিদ্রদের সম্পর্কে। ওপর থেকে দেখলে এই প্রকাশ সর্বদা পরিশুদ্ধ, ঘোমটা দেয়া, দ্ব্যর্থবোধক- এই হল তার বাইরের চেহারা। নিচের দিকে; কর্কশ, সোজাসুজি, খোলামেলা- তার আসল চেহারা। শ্রমিকের স্থুল প্রয়োজন, ধনীর পরিশোধিত প্রয়োজনের চাইতে অনেক বেশি লাভজনক। লন্ডনের ঘুপচি ঘরগুলো ঘরের মালিককে প্রাসাদগুলোর চাইতে বেশি লাভ দেয়; বলতে গেলে, জমিদারদের চাইতে তারা বেশি ধনদৌলত তৈরী করে আর এভাবে (রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের ভাষায় বললে) বেশি সামাজিক ধনদৌলত তৈরী হয়।
শিল্প হিসেব কষে প্রয়োজনের পরিশোধনের উপর। তার হিসেবটা হল ঠিক ততটাই তাদের স্থুলত্বের ওপর। সে হিসেব বরং তাদেরই উৎপাদন করা কৃত্রিম স্থুলত্বের উপর, অতএব, এর বাস্তব উপভোগ হল নিজেকেই বেকুব বানানো । প্রয়োজনের স্থুল বর্বরতার মাঝেই এই মায়া পরিতৃপ্তি, এই সভ্যতা টিকে আছে। তাই ইংল্যান্ডের চোলাই মদের দোকানগুলোই ব্যক্তিসম্পত্তির প্রতীকি উপস্থাপন। সেখানকার বিলাসই শিল্প বিলাস এবং ধনদৌলতের আসল সম্পর্ক উন্মোচন করে। তাই সঠিকভাবে এই উপভোগ কেবল ছুটির দিনের ফুর্তি, ইংরেজ পুলিশও এতে খুব গাঞ্চ করে না।
এর মধ্যেই আমরা দেখেছি রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রী শ্রম ও পুঁজির ঐক্যকে কতো ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন : (১) পুঁজি হল পুঞ্জিভূত শ্রম (২) উৎপাদনের মাঝে পুঁজির উদ্দেশ্যে (অংশত মুনাফা সহ পুঁজির পুনরুৎপাদন, অংশত কাচামাল হিসেবে পুঁজি মানে শ্রমের মালমশলা, আর অংশত এক স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করার হাতিয়ার হিসেবে কারণ শ্রমের সাথে সরাসরি সমান করা যন্ত্রও পুঁজি)- হল উৎপাদনশীল শ্রম । (৩) শ্রমিক হল পুঁজি। (৪) মজুরী হল পুঁজির ব্যয় (৫) শ্রমিকদের সাপেক্ষে, শ্রম হল তার জীবন- পুঁজির পুনরুৎপাদন (৬) পুঁজিপতির সাপেক্ষে, শ্রম হল তার পুঁজির ক্রিয়াশীলতার একটি প্রেক্ষিত।
শেষে, (৭) রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রী পুঁজি এবং শ্রমের আসল ঐক্যকে পুঁজিপতি এবং শ্রমিকের ঐক্য হিসেবে স্বীকার্যকরণ করে; এ হল আসল বেহেশতী হালত। যেভাবে এই দুই প্রেক্ষিত, দুজন ব্যক্তির রূপে মারামারি করে, রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রীর কাছে তা আকস্মিক ব্যাপার তাই তাকে তারা ব্যাখ্যা করেন বাহ্যিক ঘটনার বরাত দিয়ে। (মিল দেখুন)*
যে জাতি এখনো মূল্যবান ধাতুর সংবেদনগত ঝলমলানিতে চোখ ধাঁধিয়ে আছে, তাই এখনো যারা ধাতব মুদ্রার প্রতিক-পূজারী, তারা পূর্ণ বিকশিত অর্থ-জাতি নয়। ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের সাথে মেলান।
যে সীমা পর্যন্ত তাত্ত্বিক ধাঁধার সমাধান হাতে কলমের কাজ, আর যাকে প্রয়োগের মাধ্যমেই প্রভাবশীল করতে হয়; যে সীমা পর্যন্ত বাস্তব প্রয়োগ এক বাস্তব এবং সদার্থক শর্ত, সেই সীমা প্রদর্শিত হয়, উদাহরণস্বরূপ, এই প্রতিক পূজায়। এই প্রতিক-পূজারীর সংবেদনগত চৈতন্য গ্রীকদের চাইতে ভিন্ন, কারণ তার সংবেদনগত অস্তিত্ব ভিন্ন। সংবেদন এবং মরমের মাঝের অমূর্ত বৈরীতা ততদিন পর্যন্তই প্রামানিক যতদিন না প্রকৃতির প্রতি মানুষের অনুভূতি, প্রকৃতির মানব সংবেদন এবং তাই মানুষের প্রাকৃতিক সংবেদনটিও মানুষের নিজস্ব শ্রমে উৎপাদিত হচ্ছে।
সাম্য শব্দটি জার্মান জ্ঞঐদব = ঐদবজ্ঞ (আমি = আমি)(১৭) এর ফরাসি অনুবাদ ছাড়া কিছুই না, মানে রাজনৈতিক আঙ্গিকে। কমিউনিজমের ভিত্তি হিসেবে সাম্য এর রাজনৈতিক ন্যায়ানুগতা। যখন জার্মানরা একে সার্বিক আত্ম-চৈতন্য বলে ধারণা করে ন্যায় প্রতিপন্ন করে- ব্যাপারটা একই ঘটে। স্বাভাবিক ভাবে, বিচ্ছিন্নতাকে অতিক্রম করা সর্বদাই যাত্রা করে সেই বিচ্ছিন্নতার আঙ্গিক হতে যা দাপুটে ক্ষমতা : জার্মানীতে আত্ম-চৈতন্য; ফ্রান্সে সাম্য, কারণ তা রাজনীতি; ইংল্যান্ডে এর মাপকাঠি হিসেবে কেবল বাস্তব, বস্তুগত প্রায়োগিক প্রয়োজনকেই নেয়া হয়। প্রুঁধোকে এই জায়গা থেকে সমালোচনা আর প্রশংসা করতে হবে।
যদি আমরা খোদ কমিউনিজমকে অস্বীকৃতির অস্বীকৃতি হিসেবে এর চরিত্রটির কারণে ব্যক্তি সম্পত্তির নেতিকরণের মধ্যস্থতার মাধ্যমে মানব সারসত্তার যথার্থতা হিসেবে বৈশিষ্ট্যায়িত করি- এখনো বাস্তব, আত্ম-উৎসারিত হিসেবে না দেখে যদি তাকে নিছক পুরনো জার্মান কেতায় [...] ব্যক্তি সম্পত্তি হতে উৎপত্তি লাভ করা এক অবস্থান হিসেবে দেখি- যা হেগেলের প্রপঞ্চ বিদ্যার পথে [...] এক জিতে নেয়া মুহূর্তের মত সমাপ্ত হয়।কেউ এর দ্বারা তৃপ্ত হতে পারে; কেবল মানব সত্তার [...] ব্যাপারে তার সচেতনতা [...] আগের মত তার চিন্তার বাস্তব অতিক্রমন দ্বারা [...], তাই তার কাছে মানুষের জীবনের বাস্তব বিচ্ছিন্নতা আগেরমতই থেকে যায়, এ রকম করে ভেবে কেউ এর ব্যাপারে যতই সচেতন হউক না কেন। তাই এটি (বিচ্ছিন্নতার অস্বীকৃতি) সারা যেতে পারে শুধুমাত্র কমিউনিজম প্রবর্তন করে।*
ব্যক্তি সম্পত্তির ভাবটি বিলোপ করতে কমিউনিজমের ভাবটি একদম যথেষ্ট। বাস্তব ব্যক্তি সম্পত্তিকে বিলোপ করতে বাস্তব কমিউনিস্ট ক্রিয়া লাগে। ইতিহাস এ দিকেই নিয়ে যাবে; আর এই সঞ্চালন, যাকে আমরা এর মধ্যেই তত্ত্বে আত্ম-অতিক্রমকারী সঞ্চালন বলে জেনেছি, বাস্তবে তা খুব কর্কশ এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া গঠন করবে। তবে যাত্রাতেই এই ঐতিহাসিক সঞ্চালনের শুধু লক্ষ্যই নয়, সীমিত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সচেতনতা এবং একে ছাপিয়ে যাওয়া এক চৈতন্য অর্জন করাটাকে আমরা অবশ্যই একটা সত্যিকারের অগ্রগতি বলে বিবেচনা করবো।
যখন কমিউনিস্ট কারুশিল্পীরা একে অপরের সাথে জোট বাঁধে, তখন তত্ত্ব, প্রচার ইত্যাদিই তাদের প্রথম লক্ষ্য। কিন্তু একই কালে, এই জোট বাধার ফলস্বরূপ তারা এক নতুন প্রয়োজন অর্জন করে- সমাজের জন্য প্রয়োজন, আর যা উপায় বলে মনে হয় তা-ই হয় লক্ষ্য। এই হাতে- কলমের প্রক্রিয়াতে সবচেয়ে চমৎকার ফল পর্যবেক্ষণ করা যায় যখনি ফরাসি সমাজতন্ত্রী শ্রমিকদের একত্রে দেখা যায় তখন। ধুমপান, পান, আহার ইত্যাদি এখন আর তাদের কাছাকাছি আনার বা তাদের যোগাযোগের উপায় নয়। সঙ্গ, জোটবাঁধা এবং আলোচনাই (যার আবার লক্ষ্য হল সমাজ) তাদের জন্য যথেষ্ট। মানুষের ভ্রাতৃত্ব তাদের মাঝে নিছক কোন বুলি নয় বরং জীবনের বাস্তবতা। তাদের শ্রম কঠোর দেহ হতে আমাদের ওপর বিকিরিত হয় মানুষের মহত্ত্ব। যখন রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র দাবি করে যে চাহিদা এবং যোগান সর্বদাই একে অপরকে ভারসাম্যে রাখে, তখনি সে ভুলে যায় যে তার নিজের দাবি অনুসারেই (জনসংখ্যা তত্ত্ব) জনসংখ্যার যোগান সর্বদা চাহিদা অতিক্রম করে। আর তাই তা সমগ্র উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রামাণিক ফলাফলে মানুষের অস্তিত্ব, চাহিদা এবং যোগানের মাঝের তাল না মেলা এর সবচেয়ে ধাক্কা মারা প্রকাশটি পায়।
উপায় হিসেবে মনে হওয়া অর্থ যে সীমা পর্যন্ত বাস্তব ক্ষমতা এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী লক্ষ্য গঠন করে- যে সীমা পর্যন্ত সাধারণভাবে উপায়টি (যা আমাকে এক সত্তায় বদলে দেয়, যা আমাকে বিজাতীয় বিষয়গত সত্তার দখল প্রদান করে) এর নিজের মাঝেই এক লক্ষ্য ...... তা এই ঘটনা থেকে পরিস্কার দেখা যায় যে ভূমিগত সম্পত্তি (যেখানেই ভূমি জীবন, অশ্ব এবং তরবারীর উৎস, সেখানেই এগুলো জীবনের বাস্তব উপায়) বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষমতা হিসেবেও স্বীকৃত। মধ্যযুগে কোন সামাজিক জমিদারী তরবারী বহন করার অনুমতি পাওয়া মাত্রই মুক্তি লাভ করতো। যাযাবরদের মাঝে ঘোড়াই আমাকে স্বাধীন মানুষ এবং জনসম্প্রদায়ের জীবনের অংশীদার করে।
আমরা পূর্বে বলেছি যে মানুষ গুহাবাসে ফিরে যাচ্ছে, ইত্যাদি- কিন্তু সেই ফেরা এক বিচ্ছিন্ন, মন্দ অভিপ্রায়ী আঙ্গিকে ফিরে যাওয়া। কোন বন্য মানুষ তার গুহার মাঝে এক স্বাভাবিক উপাদান, এই গুহা তাকে সুরক্ষা দেয়, তার কাজে লাগে। এখানে সে আর নিজেকে আগন্তুক ভাবে না, বরং জলের মাঝে মাছের মত স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কিন্তু গরীব মানুষের ঝুপড়ি ঘর একটা বৈরী উপাদান, এমন এক বাসস্থান যা বিজাতীয় ক্ষমতা হয়ে থেকে যায়। সেই ঘর গরীব মানুষের কাছে নিজেকে ততটাই মেলে দেয় গরীব মানুষ তাকে যতটা নিজের রক্ত-ঘাম পান করায়। এই ঘরকে সে নিজের কুটির বিবেচনা করতে পারেনা- যেখানে সে দম্ ফেলে বলতে পারে- যাক্, ঘরে ফিরলাম। সেখানে বরং তার মনে হয় সে অন্য কারোর ঘরে আছে, এমন কোন অচেনা মানুষের ঘরে যে সর্বদাই তাকে নজরবন্দী রাখছে, ভাড়া না মেটালেই যে তাকে ঘর থেকে ছুঁড়ে ফেলবে। এই গরীব তার আবাস আর একটা মানবগৃহের গুণগত তফাতটাও জানে, যে মানবগৃহ আছে প্রাচুর্যের স্বর্গে, অন্য জগতে।
বিচ্ছিন্নতা শুধু এই ঘটনাতে প্রকাশিত নয় যে আমার জীবন ধারণের রুজি রোজগার অন্য কারোর দখলে, আমার বাসনা এমনভাবে অন্যের দখলে যে আমিই তাতে নাক গলাতে পারি না; বিচ্ছিন্নতা এতেও প্রকাশিত যে সব জিনিসই সে নিজে যা তার থেকে ভিন্ন কিছু- আমার ক্রিয়াশীলতা অন্য কিছু আর চূড়ান্ত বিচারে তা অমানবিক ক্ষমতার [শাসনের] (ত)অধীনে (এ কথা পুঁজিপতিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য)।
নিষ্ক্রিয়, অমিতব্যয়ী ধনদৌলতের এক আঙ্গিক পুরোপুরি ফুর্তি আমোদে খরচ হয়, যার মজা লুটনেওয়ালারা আচরণ করে একদিকে উদ্দেশ্যহীনভাবে উন্মত্তের মত নিজেকে খরচ করে ফেলা এক ব্যাঙের ছাতার মতো। অপরদিকে সে অন্যের দাস-শ্রমকে (মানব ঘাম আর রক্ত) গণ্য করে তার লালসার শিকার হিসেবে। তাই সে খোদ মানুষের আর এজন্য এমনকি নিজের সত্তাকেও এক বলিকৃত এবং বিপদজনক সত্তা হিসেবে জানে। মানুষের ধনদৌলতকে খোলামকুচি গণ্য করাটা প্রতিভাসিত হয়, অংশত ঔদ্ধত্য আর বে-হিসেবী খরচে যা কিনা শত শত আদম সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে পারতো আর অংশত সেই কুখ্যাত মায়া হিসেবে যে তাদের বল্গাহীন অপব্যয় এবং বিরামহীন, অনুৎপাদনশীল ভোগ অন্যের শ্রম আর তাই তার নিজের টিকে থাকার শর্ত। সে মানুষের প্রামাণিক ক্ষমতার উপলব্ধিকে কেবল তার নিজের মালসামান, হুজুগ আর খেয়াল, নিজের অদ্ভুত সব ধারণার উপলব্ধি বলে গণ্য করে। এই ধন-দৌলত (যা কিনা অপরদিকে আবার ধনদৌলতকে জানে নিছক রুজি-রোজগার বলে, জানে এমন একটা কিছু বলে যা অকর্মের ঢেকি, যাকে নিশ্চিহ্ন হতে হবে আর তাই যা একই সঙ্গে দাস এবং মালিক, একই সঙ্গে মহৎ এবং নীচ, হুজুগে, বল্গাছাড়া, আকাশকুসুমী, পরিশোধিত, সু-সংস্কৃত এবং বাগ্মী-) এখনো ধন-দৌলতকে নিজের ওপরেই এক আকাট বিজাতীয় ক্ষমতা বলে জেনে উঠতে পারেনি : এটি বরং এর মাঝে দেখতে পায় কেবল এর নিজের ক্ষমতা, আর ধনদৌলত [নয়] বরং উপভোগই [এর চূড়ান্ত] লক্ষ্য।
এই [...] আর সংবেদনগত চেহারা দিয়ে অন্ধ সম্পদের সম্পর্কিত মায়া হুমকি পাচ্ছে কার্যরত, সংযমী, গতানুগতিক, হিসেবী শিল্পপতিদের কাছ থেকে। এই শিল্পপতিরা ধনদৌলতের সম্পদের ব্যাপারে ভালোভাবেই ওয়াকিবহাল। তারা অন্যের আত্ম-রতির জন্য আরো বড় ময়দান সরবরাহ আর তার উৎপন্নের ব্যাপারে তাকে অতিবিগলিত স্তুতি বাক্য বর্ষণ করার কালে (কেননা তার উৎপন্নগুলো টাকা নষ্ট করা লোকের রুচির প্রতি অসংখ্য সাধুবাদ ছাড়া কিছুই না) তারা জানে একমাত্র কাজে লাগার পথে কেমন করে অন্যের ক্ষীণায়মান ক্ষমতাকে নিজের জন্য ঠিকঠাক করে নিতে হয়। তাই যদি প্রথমে শিল্প ধনদৌলতকে অপব্যয়ী, রঙচঙে কল্পনাময় ধনদৌলতের ফল বলে মনেও হয়, তবে এর গতি, এর জন্মসূত্রে পাওয়া গতি রঙচঙে কল্পনাটিকেও বাইরে ছুঁড়ে দেবে এক সক্রিয় পথে। কারণ লাভের হারে ক্রম-অবনতি শিল্পগত বিকাশের একটা আবশ্যকীয় পরিণতি এবং ফলাফল। অমিতব্যয়ী ভাড়াটের আয়-রোজগার তাই দিন দিন ফুর্তি আমোদের ক্রমব